[ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অপেক্ষায় ভোটার ও সাধারণ জনগণ ]
শাহজাহান ফকির, নিজস্ব প্রতিবেদক : আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। পৌনে চার লাখ ভোটারের এই আসনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে, যা স্থানীয় রাজনীতিতে এনেছে নতুন উত্তাপ। বিশেষ করে বিএনপিতে মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় দলের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা প্রকাশ্যে এসেছে। এছাড়া বিগত ৫ আগস্ট/২৫ইং ছাত্র-জনতার গণঅভূত্থানে আওয়ামীলীগের সভানেত্রী পালিয়ে যাওয়া নির্বাচনে অংশগ্রহনে দলটির কোন সুযোগ-সুবিধা বর্তমান বিদ্যমান নেই। তবে অন্যান্য দলগুলোও একক প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনী মাঠে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছে। এ আসনে বিএনপি, জামায়েত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও গণঅধিকার পরিষদ এ পাচঁটি দলের মধ্যে ভোটের লড়াই হওয়ার শতভাগ সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নির্বাচনের পরিস্থিতি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে অংশগ্রহনের সুযোগ পেলে অন্যান্য দলগুলোর মধ্য থেকে ভোটের লড়াইয়ে যোগ দেওয়ারও সম্ভাবনা আছে। তবে এ আসনটির ইতিহাসে বিএনপির শক্ত অবস্থান হলেও জামায়েত সহ অন্যান্য ইসলামী দলগুলোকে বাকাঁ করে দেখার সুযোগ নেই। এছাড়া জুলাই চেতনাকে ধারন করে নতুন বাংলাদেশ গঠনে কাজ করতে চায় নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি। ভোটের মাঠে প্রার্থীরা সকলেই সংসদ সদস্য প্রার্থী। তাই সকল রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী এলাকা নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জনগণের মন জয় করাই এখন একমাত্র লক্ষ্য হতে হবে নেতাকর্মীদের। কারণ দলের নেতাকর্মীদের ভোট তথা দলীয় ভোটের উপর নির্ভর করে না জয়-পরাজয়। জয়-পরাজয় নিশ্চিত হয় সাধারন জনগণের নির্দলীয় ভোট। সাধারণ জনগণ যেদিকে যাবেই ভোটের পাল্লা সেদিকেই ভারী হবে।
আসন্ন নির্বাচন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবং নির্বাচন কমিশন সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই নির্বাচনকে ঘিরে নান্দাইলের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। চলছে উপজেলার একটি পৌর সভা সহ ১৩টি ইউনিয়নের বিভিন্ন হাট-বাজারের চায়ের স্টলে সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা ও পর্যালোচনা। বিশেষ করে বিএনপির ৫ জন মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নিয়ে কথাবার্তার শেষ নেই। তবে মাঠে বিএনপি ও জামায়েতের তোড়জোর বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশ নায়ক তারেক রহমানের ৩১ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে মনোনয়ন পেতে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন পাঁচজন নেতা। প্রত্যেকেই নিজ নিজ অনুসারীদের নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন: সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম আনোয়ারুল হোসেন খান চৌধুরীর পুত্র ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপি’র সদস্য ও নান্দাইল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইয়াসের খান চৌধুরী, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বিএনপি নেতা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম শামস (তিনি বিএনপির দুর্দিনে লড়াই সংগ্রামে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের মামলা-হামলায় বারবার কারানির্যাতিত নেতা নান্দাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র এএফএম আজিজুল ইসলাম পিকুলের বড় ভাই), চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও বীরমুক্তিযোদ্ধা মরহুম খুররম খান চৌধুরীর পুত্র ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপি ও নান্দাইল উপজেলা বিএনপির সদস্য নাসের খান চৌধুরী, ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপি’র সদস্য ও নান্দাইল উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাবেক ছাত্রনেতা এমডি মামুন বিন আব্দুল মান্নান, সাবেক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) আনোয়ারুল মোমেন তিনিও বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন।
বিগত নির্বাচনগুলোতেও এই আসনে বিএনপির একাধিক প্রার্থী থাকায় দলের মধ্যে বিভক্তি দেখা গিয়েছিল। এবারও একাধিক প্রার্থী থাকায় স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে গ্রুপিং-লবিং চোখে পড়ার মতো। দলটির ত্যাগী নেতাকর্মীদের ভাষ্যমতে- দলের দূর্দিনে যারা মাঠে ছিল, হামলা-মামলা ও নির্যাতন সহ্য করে দলের পাশে থেকেছিলো, তাদের দিকটি বিবেচনা করে দলের হাইকমান্ড বিএনপির মনোনয়ন দিবেন। তবে বিএনপি’র মধ্যে বিভক্তি ও নেতাকর্মীদের দ্বন্দের অবসান না হলে এবং যোগ্য ব্যক্তি দলটির মনোনয়ন না পেলে আসনটি হারার শঙ্কা রয়েছে।
বিএনপি ছাড়াও অন্যান্য প্রধান দলগুলোও নান্দাইল আসনে নিজেদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। জামায়াতে ইসলামীতে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চানকে জামায়াত তাদের প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মো. আশিকিন আলম রাজন এই আসন থেকে এনসিপি’র হয়ে নির্বাচন করবেন। গণঅধিকার পরিষদে মাহবুব আলম মাহবুবকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রার্থী হিসাবে মাওলানা মুফতি সাইদুর রহমান চরমোনাই পীরের দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন।
দলের প্রার্থীরাই নান্দাইলকে একটি আধুনিক ও মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করছেন। তাদের প্রতিশ্রুতির তালিকায় রয়েছে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন, এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন। এছাড়াও জুয়া, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়ার কথাও বলছেন তারা।
তবে নান্দাইলের সাধারণ জনগণ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছেন। তারা আশা করছেন, এবারের নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিয়ে এলাকার কাঙ্খিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবেন। তবে নির্বাচন কবে হবে, তা নিয়ে এখনো কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্তর্র্বতীকালীন সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিলেও দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সব মিলিয়ে, নান্দাইলের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন বেশ সরগরম এবং আগামী দিনগুলোতে নির্বাচনী উত্তাপ আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।