প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ২:৫৪ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ৯, ২০২৬, ২:৪২ অপরাহ্ণ
পরিবারহীন মানুষের শেষ ঠিকানা নান্দাইলের মাতৃছায়া বৃদ্ধাশ্রম

নিজস্ব প্রতিবেদক: ময়মনসিংহের নান্দাইলে পরিবারহীন মানুষের মুখে হাসিঁ ফুঁটাতে উপজেলার চরবেতাগৈর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত চরকামটখালী গ্রামে গড়ে উঠেছে ‘মাতৃছায়া সমাজকল্যাণ সংস্থা ও বৃদ্ধাশ্রম’। পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম ছোটবেলায় তাঁর মা—বাবাকে হারিয়েছেন, ফলে তাঁদের সেবা করতে পারিনি। তাই মা—বাবার ভালোবাসাকে উৎস্বর্গ করে এই বৃদ্ধাশ্রম তৈরী করেছেন। তিনি জানান, নিজের শৈশবের না—পাওয়ার কষ্ট আর হাসপাতালে দুই দশকের চাকরিজীবনের করুণ অভিজ্ঞতা থেকে প্রবীণদের জন্য এই পরম আশ্রয়ের সৃষ্টি।
সরজমিনে জানাগেছে, পরিবারহীন, অবহেলিত ও পরিচয়হীন প্রবীণদের জন্য এটি যেন এখন এক টুকরো শান্তির নীড়। ২০১৮ সালে নিজের মাত্র ৮ শতাংশ জমিতে একটি টিনশেড ঘর তুলে রফিকুল ইসলাম আশ্রয়কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৯ সাল থেকে সেখানে পরম যত্নে আশ্রয় পেতে শুরু করেন বিভিন্ন স্থানে ফেলে যাওয়া কিংবা পরিচয়হীন অসহায় প্রবীণরা। পরবর্তীতে ২০২২ সালে 'অ্যাপেক্স ক্লাব অব ময়মনসিংহ'—এর সহায়তায় আশ্রয় কেন্দ্রটিতে একটি আধা—পাকা ঘর তৈরি করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৩৩ জন প্রবীণ এখানে আশ্রয় পেয়েছেন। যার মধ্যে ১২ জন বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন এবং ৪ জন ফিরে গেছেন নিজেদের পরিবারের কাছে। বর্তমানে আশ্রমটিতে ১৪ জন নারী, ৬জন পুরুষ এবং ১টি শিশু আশ্রয়ে আছেন। রফিকুল ইসলামের পাশে আছেন তাঁর স্ত্রী কল্পনা আক্তার। দুজনে মিলে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষগুলোর সেবা—শুশ্রূষা ও পরিচর্যা করে যাচ্ছেন। বৃদ্ধাশ্রমের পাশে আছে স্থানীয় প্রশাসন ও সুশীল সমাজ।
আশ্রমে আসা প্রতিটি মানুষের পেছনে রয়েছে হৃদয়বিদারক কোনো না কোনো গল্প। তারার মা (৯০) নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা মহর আলী ফকিরের স্ত্রী। সন্তান না থাকায় তিন বছর আগে স্বজনেরা তাঁকে এখানে রেখে যান। বয়স ৯০ পার হলেও তিনি এখনও পথ চেয়ে থাকেন বাড়ি ফেরার আশায়। জরিনা বেগম (৭৫) ছেলেরা মারা যাওয়ার পর নাতি ও পুত্রবধূরা ভাত না দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিলে তাঁর স্থান হয় এই আশ্রমে। তহুরুন্নেছা (৬৫) মেয়েকে নিয়ে বাড়ি যাওয়ার পথে র নির্মমভাবে তাঁকে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যায়। পরবর্তীতে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে এখানে নিয়ে আসে। ৭৫ বছর বয়সী ইদ্রিছ আলী পেশায় ছিলেন বেসরকারী চাকুরীজীবি, পরিবারে স্ত্রীসহ ১ছেলে ও ১ মেয়ে থাকা স্বত্বেও আজ তিনি বৃদ্ধাশ্রমে। সবাই তাকে ছেড়ে গিয়েছেন, কেউ তাঁর কোন খোঁজ নেয়, আরও নেওয়ার আশাও তিনি করেন না। একই অবস্থায় দুলাল মিয়া, বেলায়েত হোসেনসহ আরও অনেকেই। অপরদিকে ছোট্ট শিশু মাইশার কলকাকলিতে মুখরিত থাকে আশ্রম প্রাঙ্গণ। আশ্রয়ণের লোকজনই এখন তাঁর বড় আপনজন।
রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে নিবন্ধনের আওতাভূক্ত। সরকারের সহযোগিতার পাশাপাশি মানুষের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে খাবার আর ওষুধ জোগাড় করি। যত দিন বাঁচব, এদের সেবা করব। আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানরা এদের দেখাশোনা করবে। তবে এর জন্য একটি ভালো ভবনের প্রয়োজন।
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত মাতৃছায়ার এই উদ্যোগকে অত্যন্ত মানবিক উল্লেখ করে জানান, সরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
পরিবারহীন প্রবীণদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং এই মানবিক কার্যক্রমকে টিকিয়ে রাখতে যে কেউ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পরিচালক: মো. রফিকুল ইসলাম (ফোন: ০১৭৮৭৩৮৫৭০৯) যোগাযোগ করার আহ্বান জানান।

Copyright © 2025 Norsundanews24.com . All rights reserved.