নিজস্ব প্রতিবেদক: ময়মনসিংহের নান্দাইলে পাওনা টাকা আদায়ে অভিনব পন্থা অবলম্বন করে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছেন উপজেলার টংগীর চর গ্রামের ইন্তাজ আলী (৬৫)। বিভিন্ন জনের কাছে শ্রমিকের মজুরি বাবদ বকেয়া টাকা না পেয়ে থানা পুলিশের নির্দেশে তাদের নাম ও বকেয়া টাকার পরিমাণ উল্লেখ করে একটি ব্যানার টানিয়েছিলেন তিনি। এই ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় ও সামাজিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে বিষয়টি থানা পুলিশের নজরে আসলে বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) ওই ব্যানার নামিয়ে নিয়েছেন তিনি এবং পুলিশকে নিয়ে পাওনা আদায়ে তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন। ইন্তাজ আলীর এই অভিনব কৌশল সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাওনা আদায়ের এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। যদিও ব্যানারটি সরানো হয়েছে, তবে এই ঘটনা জনমনে বকেয়া পরিশোধের দায়িত্ব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে।
জানাগেছে, ইন্তাজ আলী, চার ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। তার স্ত্রী দুই বছর আগে মারা গেছেন। সামান্য ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই। জীবনধারণের জন্য তিনি গাছ কাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বিভিন্ন গাছ ব্যবসায়ী এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাছ কাটতে গিয়ে অনেকের কাছে তার পারিশ্রমিকের টাকা বকেয়া পড়ে। বারবার তাগাদা দিয়েও টাকা আদায় করতে না পেরে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। বয়সের ভারে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি বর্তমানে গাছ কাটার মতো কঠোর কাজ ছেড়ে দিয়েছেন এবং মানুষের বাড়িতে টুকটাক কৃষি কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন।
এক সপ্তাহ আগে ইন্তাজ আলী নান্দাইল থানায় পাওনা টাকা সংক্রান্ত একটি অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশ তাকে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের পরামর্শ দিয়েছিল। এরপরই তিনি ৫০০ টাকা খরচ করে ৪ ফুট বাই ৫ ফুট আকারের একটি রঙিন ব্যানার তৈরি করেন, যেখানে ছয়জন পাওনাদারের নাম এবং বকেয়া টাকার পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছিল। গত সোমবার ব্যানারটি টংগীর চর তিন রাস্তার মোড়ে একটি দোকানের সামনে টানিয়ে দেন।
ব্যানারটি টানানোর পরই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। তার এই পদক্ষেপটি অধিকাংশ মানুষের কাছে বাহবা পেলেও, পাওনাদাররা ক্ষিপ্ত হন। অবশেষে বুধবার পুলিশের হস্তক্ষেপে নান্দাইল মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ইন্তাজ আলীকে ব্যানারটি সরানোর পরামর্শ দেয়। এরপর পুলিশ ইন্তাজ আলীকে সাথে নিয়ে পাওনাদারদের বাড়িতে গিয়ে টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেয়।
বকেয়ার তালিকায় থাকা স্থানীয় গাছ ব্যবসায়ী হুমায়ূন জানান, ইন্তাজ ৬০০ টাকা রোজে কাজ করে পুরো টাকাই নিয়ে গেছেন। এখন তিনি ৭০০ টাকা রোজ দাবি করে অতিরিক্ত ২ হাজার ৬ শত টাকা চাইছেন, যা অযৌক্তিক। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “ব্যানার না ছাপিয়ে এমনি কিছু টাকা দাবি করলে দিতাম, এখন একটি পয়সাও আর দেব না।”
অন্যদিকে, খালপাড় বাজারের একটি স মিলের মালিক সুজন মিয়া জানান, তার কাছে ইন্তাজ আলীর ৭৫০ টাকা পাওনা আছে, যা তিনি জানতেন না। পুলিশ তাগাদা দিতে আসার পর তিনি বিষয়টি জেনেছেন এবং আজই ওই টাকা পরিশোধ করে দেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে তার মতে, ব্যানার বানানোটা উচিত হয়নি।
স্থানীয় হারুন অর রশিদ (৭০) জানান, ইন্তাজ আলী যৌবনে খুব নামকরা গাছ কাটার শ্রমিক ছিলেন। এখন বয়সের ভারে কাজ করতে পারছেন না। এ অবস্থায় তার টাকা পরিশোধ না করাটা খুবই অমানবিক।
ইন্তাজ আলী বলেন, তিনি পুলিশের সাথে পাওনাদারদের কাছে যাওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, থানা থেকে স্থানীয়ভাবে সমাধানের পরামর্শ পাওয়ার পরই তিনি ব্যানার লিখে সবাইকে জানানোর সিদ্ধান্ত নেন।
নান্দাইল মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খন্দকার জালাল উদ্দিন মাহমুদ জানান, ওই ব্যক্তি থানায় আসেননি, সম্ভবত তিনি নিজ থেকেই ওই ব্যানারটি টানিয়েছিলেন। তবে পুলিশ গতকাল গিয়ে ইন্তাজ আলীকে নিয়ে পাওনাদারদের কাছে গিয়ে টাকা পরিশোধের জন্য তাগাদা দিয়ে এসেছে। এরপরও তিনি কোনো অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

