চালের মূল্যবদ্ধি ও সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে সংকটে খাদ্য নিরাপত্তা: সরকারের জরুরি পদক্ষেপের দাবীতে খানির মানববন্ধন
চালের অস্বাভাবিক মূল্যবদ্ধি এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে গভীর উদবেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক খানি। জনজীবনে নেমে আসা এই তীব্র সংকট নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহনের দাবিতে দেশব্যাপী মানববন্ধনের আয়াজন করেছে নেটওয়ার্কটির সদস্য সংগঠনগুলা।
“ভাতের পাতে স্বস্তি ফেরাও” শ্লোগানে আজ মঙ্গলবার (১ জুলাই ২০২৫) ময়মনসিংহে ফুলপুর থানার সম্মুখে উপজেলায় মানববন্ধন কর্মসূচির আয়াজন করে খানির সদস্য সংগঠন অন্যচিত্র ফাউন্ডশন। মানববন্ধনে কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, অধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। চাল এখন বিলাসিতা, মানুষের জীবন দুর্বিষহ শ্লোগানে মানববন্ধন অনুষ্ঠানে অন্যচিত্র ফাউন্ডশনের নির্বাহী পরিচালক রেবেকা সুলতানা বলেন, “বর্তমান বাজারে চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম সংকট ফেলেছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ে। চালের এই মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট করেছে। সরকারকে বাজার মনিটরিং, মজুদ নিয়ন্ত্রণ ও সহায়ক নীতিমালা গ্রহনের মাধ্যমে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।”
জেলা নাগরিক প্ল্যাটফর্মর সদস্য সাংবাদিক শাহ নাফিউল্লাহ সৈকত বলেন,”চালের দাম হঠাৎ বৃদ্ধিতে মানুষ খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকেই কম মানের চাল কিনছেন, যার ফলে পুষ্টিহীনতা বাড়ছে এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা রয়ছে। বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধ করতে হবে এবং ন্যায্য মূল্যে চাল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।” গবেষক ও উনয়নকর্মী ইমন সরকার বলেন,”চাল এখন নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। খাদ্য মৌলিক অধিকার হলেও বর্তমানে তা উপেক্ষিত। অবিলম্বে চালের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
পরিসংখ্যানগত দিক থেকে পরিকল্পনা কমিশনের জুন ২০২৫-এর হালনাগাদ তথ্যমতে, সামগ্রিক খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এককভাবে ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। অথচ বোরো মৌসুমে উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার পরও বাজারে স্বস্তি আসেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, মিল পর্যায়ে খরচ বৃদ্ধি, ধানের দামের অস্থিরতা, অবৈধ মজুদদারি এবং বাজার মনিটরিংয়ের দুর্বলতার কারনে এই সংকট তৈরি হয়েছে। কৃষকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, অথচ ভোক্তাকে চড়া দামে চাল কিনতে হচ্ছে।
কালের কন্ঠের সাংবাদিক মোস্তফা খান বলেন “আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতায় মানুষ খাবার তালিকা থেকে পুষ্টিকর উপাদান বাদ দিয়ে শুধু ভাত খাচ্ছেন। এতে শিশু ও বয়ষ্কদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। মানসিক চাপও বাড়ছে।”
কৃষক জহর আলী বলেন, ” যে ভাত আমরা ফলাই তাই সস্তায় মহাজনের কাছে বেইচা আবার আমরা চড়া দামে কিন্না খাই। আমাদের দেখার কেউ কি নাই?”
রিকসাচালক সিকান্দার বলেন, ” সারাদিনে যা আয় করি তার অর্ধেক লাগে চালের পিছনে। কি খায়া বাচুম আমরা? আমরা ৪০ টাকা কেজিতে চাইল কিনবার চাই।”
জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং প্রতি ১০ জনে ৩ জন প্রয়োজনীয় খাদ্য সংস্থান করতে পারছেন না। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হিসাবে, ২০২৪ সালের শেষে ন্যূনতম খাবারের জন্য একজন মানুষের মাসিক ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৫১ টাকা, যা খাদ্য দারিদ্র্যসীমার চেয়ে ৬৯.৫% বেশি। ফোরাম অন ইকালজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ময়মনসিংহ – এর সদস্য সচিব তুহিন তালুকদার বলেন,”চালের দাম শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি এখন মানবিক সংকট। সরকারের দায়িত্ব এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। ভর্তুকি মূল্যে চাল সরবরাহ এবং খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করতে হবে। মানুষের ক্ষুধা কোন রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি মানবাধিকার।” মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা চালসহ খাদ্যপন্যের মূল্যস্ফীতির এই সংকট নিরসনে সরকারের কাছে নিম্নোক্ত দাবিগুলো তুলে ধরেন:
১. কৃষকের কাছ থেকে সরকারের সরাসরি চাল ক্রয়ের আওতা বৃদ্ধি।
২. দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগাষ্ঠীর জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু।
৩. ক্ষুদ্র কষকের স্বার্থ রক্ষায় উৎপাদন, বাজার ও মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় সংস্কার।
৪. টিসিবি ও ওএমএস কর্মসূচির আওতা বাড়িয়ে প্রয়াজনভিত্তিক খাদ্য সহায়তা।
৫. বাজার সিন্ডিকেট ও মজুদদারদের অপতৎপরতা রোধে কঠোর মনিটরিং ও ব্যবস্থা গ্রহণ।
মানববন্ধনে ফুলপুর এলাকার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক, সাংবাদিক, উনয়নকর্মীসহ বিভিন শ্রেণি পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাব অংশ নেন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে দ্রুত কার্যকর উদ্যাগ গ্রহনের আহবান জানান।


