নিজস্ব প্রতিবেদক :: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভক্তির সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা গ্রুপিং এবং একাধিক নেতার মনোনয়ন প্রত্যাশা দলকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, সব বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে একক ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে ব্যর্থ হলে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনটি হারানোর ঝুঁকি শতভাগ।
নান্দাইলে বিএনপির রাজনীতিতে বিভক্তি একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। স্থানীয় পর্যায়ে নেতাদের একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে উপজেলায় বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি থাকলেও অন্তত পাঁচটি গ্রুপ সক্রিয়ভাবে পৃথক পৃথক কর্মসূচি পালন করছে, যা দলের ভঙ্গুর অবস্থাকেই স্পষ্ট করে। এই গ্রুপগুলোর নেতৃত্বে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইয়াসের খান চৌধুরী, সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ.কে.এম শামসুল ইসলাম শামস (সূর্য্য), উপজেলা বিএনপি’র সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নাসের খান চৌধুরী, উপজেলা বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক এমডি মামুন বিন আব্দুল মান্নান এবং মেজর জেনারেল (অব:) আনোয়ারুল মোমেন, আরসিডিএস, পিএসসি, এসবিপি, ওএসবিপি খেতাব প্রাপ্ত কর্মকর্তা।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশের মতে, গত ১৭ বছর ধরে সরকারের দমন-পীড়নের মুখে পড়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) শামসুল ইসলাম শামস ও তার পরিবার। ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে নান্দাইল বিএনপিকে আগলে রেখে দলের কার্যক্রম চালিয়েছেন। ২০২০ সাল থেকে ব্রিগেডিয়ার শামস সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তার ছোট ভাই, নান্দাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র এ.এফ.এম আজিজুল ইসলাম পিকুল সরকারি দলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে অর্ধশতাধিক মামলার শিকার হয়েছেন এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমনকি তাদের বড় ভাই, ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি অধ্যাপক এ.কে.এম রফিকুল ইসলামকেও একাধিক মামলায় জেল খাটতে হয়েছে। একারণে, ব্রিগেডিয়ার শামসের ত্যাগ, সততা এবং কর্মী-বান্ধব মনোভাব তাকে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে বলে মনে করছেন তার সমর্থকরা।
অন্যদিকে, আসনের সাবেক দুই সংসদ সদস্য মরহুম আনোয়ার হোসেন খান চৌধুরী ও মরহুম বীরমুক্তিযোদ্ধা খুররম খান চৌধুরীর পরিবারের দুই উত্তরসূরি ইয়াসের খান চৌধুরী এবং নাসের খান চৌধুরীর মধ্যেও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চরমে। এই দুই চাচাতো ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা নিজেদের নিরাপদ রেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই। যদিও তাদের সমর্থিত অনেক নেতাকর্মী মামলার শিকার হয়েছেন। তবে বর্ষীয়ান প্রবিণ রাজনীতিবিদ ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসাবে ও দক্ষ রাজনীতিবিদ হিসাবে সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম বীরমুক্তিযোদ্ধা খুররম খান চৌধুরীর বেশ সুনাম ছিল রাজনীতির মাঠে। খুররম খান চৌধুরী রাজনীতির মাঠে একজন দক্ষ পাকা খেলোয়ার ছিলেন। তাঁরই উত্তরসূরী দলের দূর্দিনে দলের নেতাকর্মীদের পাশে রয়েছেন এবং তাঁর নেতৃত্বে দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি নান্দাইল উপজেলা বিএনপির একজন সম্মানিত সদস্য।
এছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন খান চৌধুরী তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলের প্রতিষ্ঠাতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেটের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মনোনয়ন নিয়ে ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁরই উত্তরসূরী ইয়াসের খান চৌধুরী বর্তমানে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালনে দলকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে কাজ করছেন । তিনি দলের জন্য তাঁর মুল্যবান চাকুরীজীবন ত্যাগ করেছেন ও দলের দুর্দিনে তাঁর নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করেছেন।
একই ভাবে, দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থাকা মালয়েশিয়া বিএনপির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য এবং নান্দাইল উপজেলা বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক এমডি মামুন বিন আব্দুল মান্নানের নামেও উঠে আসে। তিনি তাঁর সমর্থিত নেতাকর্মীদের নিয়ে দলের দু:সময়ে দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করেছেন। তৃণমুলে বিএনপি’র ঐক্য ধরে রেখেছেন। তবে তাঁর নামেও কোনো মামলা না নেই।
সম্প্রতি মেজর জেনারেল (অব:) আনোয়ারুল মোমেনও মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে মাঠে নেমেছেন, যিনি বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে সেনবাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় অনেক নির্যাতন ও যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। তিনি বিএনপির আদর্শকে বুকে লালন করে শান্তির-সম্প্রীতির নান্দাইল গড়তে ও বিএনপি’র বিভক্ত নান্দাইলকে ঐক্যবদ্ধ করতে রাজনীতির মাঠে নেমেছেন।
এছাড়া,নতুন মুখ হিসাবে বিএনপি থেকে এমপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসাবে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি ও নান্দাইল পৌর বিএনপি’র সাবেক সভাপতি গোলাম হায়দার খান ফয়সাল এবং নান্দাইল উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সদস্য ও সাবেক ছাত্রনেতা কাজী এরশাদুল করিম আরমানের নামও শোনা যাচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ে তাদের প্রচার-প্রচারণা তেমন লক্ষ্য করা যায় না।
এই পরিস্থিতিতে, তৃণমূলের বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ সমর্থকরা তাকিয়ে আছেন দলের হাইকমান্ডের দিকে। তাদের স্পষ্ট অভিমত, গত ১৭ বছরে ফ্যাসিবাদীর আওয়ামীলীগের কারনে যারা হামলা, মামলা, অপমান ও নির্যাতনের শিকার হয়েও মাঠ ছাড়েননি, তাদের মধ্য থেকেই প্রার্থী নির্বাচন করা হোক। মাঠ পর্যায়ের জনমত জরিপ করে এবং ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করে মনোনয়ন দেওয়া হলে কেবল নান্দাইলে বিএনপির বিজয় সম্ভব, অন্যথায় এ আসনে হতাশাই সঙ্গী হতে পারে।

