২৬ মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা ও জাতীয়তাবাদের আত্মপ্রকাশ:- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.)
বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এমন একটি যুগসন্ধিক্ষণ রচিত হয়েছে যা কেবল ইতিহাস নয়, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং অস্তিত্বের পরিচায়ক হয়ে থাকবে অনন্তকাল। এ দিনটি যেমন রাষ্ট্রের স্বাধীনতার সূচনালগ্ন তেমনি একটি জাতির আত্মবিকাশের মুহূর্ত, একটি জনগোষ্ঠীর শতাব্দীর বঞ্চনা ও সংগ্রামের পর আত্মপ্রকাশের উন্মেষ। এ দিনটি সেই মুহূর্তকে ধারণ করে যখন তদানীন্তন পূর্ববাংলার মানুষ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছিল আর পরাধীনতা নয়, তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের উৎস খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় সেই সংকটময় সময়ে; যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার দমননীতি, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং নির্মম সামরিক অভিযান পূর্ববাংলার মানুষকে অস্তিত্বের প্রশ্নে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল এক কাতারে।
১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল ইতিহাসের এক উত্তাল সময়ের সূচনা বিন্দু। পূর্ববাংলার মানুষ রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে যে লড়াই করে আসছিল মার্চ ছিল সেই সংগ্রামের শেষের শুরু। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ববাংলার জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে একটি সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট প্রদান করেছিল, কিন্তু সেই গণরায়কে অস্বীকার করে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়।
আলোচনার নামে কালক্ষেপণ চলতে থাকে, একই সঙ্গে তারা গোপন প্রস্তুতি নিতে থাকে একটি ভয়াবহ সামরিক অভিযানের।
সেই অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’। ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালের গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা শুরু করে। অভিজাত এলাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাস; বস্তি, শ্রমিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক কোনো স্থানের জনগোষ্ঠীরই রেহাই ছিল না। এ রাতটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াল কালরাত্রিগুলোর একটি। কিন্তু ইতিহাসের অদ্ভুত এক নিয়ম আছে আঁধার যত গভীর হয় বিজয় ও প্রাপ্তির আলো তত প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেই অন্ধকার রাতেই জন্মলাভ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রকৃত সূচনা। এ সূচনার প্রারম্ভ ও প্রতীক হয়ে ওঠে দুটি ছোট শব্দ ‘রিভোল্ট’ এবং ‘স্বাধীনতা’। এ শব্দ দুটি কেবল একটি সামরিক নির্দেশনা ছিল না বরং শব্দ দুটি ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার ঘোষণা। সেই সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত বাঙালি অফিসার এবং সৈনিকদের সামনে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ছিল; তারা কি পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের আদেশ মেনে নিজেদের জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে, নাকি বিদ্রোহ ঘোষণা করবে? এ প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের প্রারম্ভিক ইতিহাসে প্রথম সুস্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছিল একজন তরুণ বাঙালি সামরিক কর্মকর্তার কণ্ঠে, যাঁর নাম মেজর জিয়াউর রহমান।
মেজর জিয়ার সেই আহ্বান ‘উই রিভোল্ট’ ছিল এক অর্থে একটি জাতীয় গণজাগরণের সূচনালগ্ন। এই একটি শব্দের মধ্যেই নিহিত ছিল প্রতিরোধ, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণা। যখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি সেনা সদস্যদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বাস্তবিক অর্থে চট্টগ্রাম ছিল সেই প্রতিরোধের অন্যতম কেন্দ্র। চট্টগ্রামের সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরোধ শক্তি দ্রুত সংগঠিত হতে শুরু করে। এই সময়েই চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রচারিত হয়, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ দেয়।
২৬ মার্চের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে মেজর জিয়া চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি ঘোষণা করেন, বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য লড়াই করছে এবং তিনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছেন। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ইতিহাসের বিচারে এ ঘোষণার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ এটি ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি সরাসরি বিদ্রোহের ঘোষণা এবং একই সঙ্গে এটি ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মের মাহেন্দ্রক্ষণ। এ ঘোষণার পরই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিরোধ জনযুদ্ধ। শহর থেকে গ্রামের মানুষ, ছাত্র থেকে কৃষক, শ্রমিক থেকে সৈনিক-সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তির সংগ্রামে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সর্বাত্মক জনগণের যুদ্ধ। এটি কেবল একটি সামরিক সংঘাত ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির মুক্তির সংগ্রাম। এ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি।
২৬ মার্চ তাই কেবল একটি তারিখ মাত্র নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের জন্মদিন। এ দিনটি আমাদের জাতিসত্তার আত্মবিকাশের সূচনালগ্ন। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিকস্বরূপ এ দিন থেকেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ একটি বহুমাত্রিক ধারণা। এটি কেবল ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ভূখণ্ডকেন্দ্রিক একটি জাতীয় চেতনা। এ চেতনার মূল ভিত্তি হলো বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রের জনগণ নিজেরাই তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এ যুদ্ধের মূল শক্তি ছিল দেশের জনগণ। এটি কোনো বহিরাগত শক্তির পরিকল্পিত যুদ্ধ ছিল না। এটি কোনো বিদেশি শক্তির দান ছিল না, এটি ছিল একটি জনগণের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। ইতিহাসে অনেক যুদ্ধের নজির রয়েছে যেগুলো আন্তর্জাতিক শক্তির দ্বন্দ্বের ফল। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি রাষ্ট্রের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। ২৬ মার্চ ছিল সেই সংগ্রামের সূচনা। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন, আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সামরিক সহায়তা মুক্তিযুদ্ধকে শক্তিশালী করেছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ছিল সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এ কারণেই ২৬ মার্চ দিনটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে আছে। এ দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কোনো দান নয়; এটি সংগ্রাম ও যুদ্ধের মাধ্যমে পাওয়া এক মহান অর্জন।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন মূলত বাস্তববাদী। এ দর্শনের মূল ভিত্তি হলো সার্বভৌমত্ব, জনগণের ক্ষমতায়ন, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এ দর্শনের বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করতে দেখতে পাই আমরা। কারণ মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি সামরিক যুদ্ধ ছিল না, একই সঙ্গে এটি ছিল একটি রাজনৈতিক বিপ্লবও। এ বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে জনগণের অধিকার, মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
২৬ মার্চের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিরোধের চেতনা। এ দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কোনো জাতি যখন অস্তিত্বের সংকটে পড়ে, তখন প্রতিরোধই একমাত্র পথ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বারবার এ প্রতিরোধের চেতনা দেখা গেছে। পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ ছিল সেই প্রতিরোধের সর্বোচ্চ প্রকাশ। কিন্তু তার আগে ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন এবং গণ অভ্যুত্থান সবই ছিল একই ধারার প্রতিফলন।
এ প্রতিরোধের চেতনা আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বাধীনতা অর্জনের পরও একটি জাতির সামনে নানা চ্যালেঞ্জ আসে। কখনো রাজনৈতিক সংকট, কখনো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, কখনো আন্তর্জাতিক চাপ এই সবকিছুর মধ্যেও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে ২৬ মার্চ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, জাতীয় ঐক্য এবং আত্মমর্যাদা ছাড়া কোনো জাতি দীর্ঘদিন স্বাধীন থাকতে পারে না।
২৬ মার্চ আমাদের আরও একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়, কোনো অপশক্তি স্থায়ী নয়। ইতিহাসে বহু শক্তিশালী সাম্রাজ্য পতিত হয়েছে, বহু স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কারণ জনগণের শক্তি শেষ পর্যন্ত সবকিছুকে অতিক্রম করে যায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এ সত্যের একটি উজ্জ্বল ও সার্থক প্রকাশ। পাকিস্তানের সামরিক শক্তি ছিল বিশাল। তাদের কাছে ছিল আধুনিক অস্ত্র, সংগঠিত বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের দৃঢ় সংকল্প এবং আত্মত্যাগের সামনে সেই শক্তি শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি।
২৬ মার্চ কেবল অতীতের ইতিহাস নয়; এটি হলো যে কোনো সময়ের জন্য ভবিষ্যৎ প্রেরণার ভিত্তি। এ দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে জাতীয় ঐক্য, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং আত্মমর্যাদা অপরিহার্য।বাংলাদেশের সামনে আজও নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে- ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতা। এ পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হলে আমাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ২৬ মার্চ সেই শিক্ষার অন্যতম উৎস। কারণ এ দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি জাতির শক্তি তার জনগণের মধ্যে নিহিত। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি আসে জনগণের ঐক্য, আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেম থেকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মানুষ যে ঐক্য ও সাহসের পরিচয় দিয়েছিল, সেটিই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক : উপদেষ্টা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়

